গল্পটা ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ২০০৮ উপলক্ষ্যে প্রথম আলো 'য় ছাপা হয়েছে।
*****************************
ছাপাখানার গন্ধটা প্রথম প্রথম সহ্য হতো না রফিক উদ্দিন আহমেদ রফিকের। এই কালিঝুলি আর সিসার অক্ষর আর কেরোসিন আর স্পিরিটের গন্ধ। ঘরটাও গুমোট। ওদিকে গোলানো আটা আর তুঁতের দ্রবণটা মিলিয়ে যে আঠা, তারও একটা গন্ধ আছে। মানিকগঞ্জের সিংগাইরের মুক্ত প্রান্তরের বাতাস থেকে এই বদ্ধ ঘরে এসে তার মনটা টিকবে কেন। এই মাথার ওপরে ঝুলমাখা বাল্বের নিচে বসে ঘাড় গুঁজে সামনে প্রুফ দেখতে গিয়ে পায়ের নিচে গন্ধমুষিকের হঠাৎ দৌড়টা টের পেয়ে আরেকটা নতুন গন্ধ রফিকের নাকে এসে লাগে। বয়রা স্কুলের মাঠভরা ছিল চোরকাঁটা, ছোটবেলায় সে যখন দৌড়ে মাঠ পেরিয়ে বাড়ি ফিরত, তখন শো শো বাতাস এসে তার কানে লাগত। তারপর মোল্লাবাড়ির পেছনের জঙ্গলটা পেরুতে গেলে আতাফুল থেকে ভেসে আসত পাকা সবরি কলার গন্ধ, এখন এই গন্ধমুষিকের সঞ্চলন থেকে সে কথাটা তার মনে পড়ে অকারণে।
বাবা তাকে এই ঢাকা শহরে এনে ছাপাখানার কাজে লাগিয়ে দিল, এটা সে মানতেই পারছিল না। সত্য বটে, দেবেন্দ্রনাথ কলেজের শিক্ষক প্রাণনাথ বাবু বাবাকে বলেছিলেন, রফিক তো কলেজ ফাঁকি দেয়। কিন্তু কলেজ ফাঁকি দিয়ে সে কী করে? নাটক করে। মানুদা নতুন নাটক লিখেছেন একটা, খুদিরামের ফাঁসি নিয়ে, এতে রফিকের খুদিরামের পার্ট করার কথা, তো সেই কারণেই শেষের দিকে রফিক একটু বেশি সময়ই দিচ্ছিল তাদের উন্েনষ নাট্যদলের জন্যে। আগের নাটক গলি থেকে রাজপথে সে একটা সাইড ক্যারেক্টার করেছিল, কিন্তু অট্টহাস্য থেকে কান্নায় ভেঙে পড়ার সিনটায় সে এত ভালো করল যে সমস্ত ক্লাপস তার বরাতেই জুটেছিল। ভাগ্যিস, হ্যাজাক বাতির তীব্র আলোর টানে ছুটে আসা পোকাগুলোর একটা ওই সময়েই তার চোখে বাড়ি মেরেছিল। ফলে চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়াতে লাগল। সেদিনই নাটক শেষে মানুদা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, খুদিরামকে নিয়ে লিখছি রফিক, এবার তুমিই হবে খুদিরাম। খুদিরামের চেহারার সঙ্গেও তোমার মিল আছে।
ব্যস। রফিক হাওয়ায় ভাসতে শুরু করল। এরপর সে খুদিরাম! একেবারে সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার। গলি থেকে রাজপথ নাটকটাই তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। কারণ পানুও ওই নাটক দেখতে গিয়েছিল বয়রা স্কুল মাঠে। রাহেলা খানম পানুর পরনে ছিল আকাশি শাড়ি, বিকেলের হলুদ আলোয় সেটা দেখাচ্ছিল সবুজ আর হ্যাজাক বাতির আলোয় সেটা অদ্ভুত একটা মেটে রং পেয়েছিল। নাটক শেষে যখন উইংসের পেছনে পর্দাঘেরা শামিয়ানা টাঙানো গ্রিনরুমে রফিক মেকাপ তুলছিল, পানুদার চোখেমুখে তখনো ভালো লাগার ঘোর, আর রফিকও বেশ ফুরফুরে মুডে গুনগুন করে গান গাইছে, মেকাপ তুলেই আবার লাগতে হবে মঞ্চ ভাঙতে, স্কুলের বেঞ্চগুলো যথাস্থানে রাখতে হবে, মঞ্চের টেবিলগুলোর বাঁধন খুলতে হবে, কলের গানওয়ালা তার সরঞ্জাম গোছাচ্ছে, এখনি তার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে, এই সময় পানুর ছোটবোন শানু এসে হাজির, ভাইজান, বুবু আপনেরে ডাকে।
পানু ডাকে? রফিকের বুকটা একটা কাকিলা মাছের মতো লাফ দিয়ে ওঠে। সেটা গোপন করে রফিক মেকাপ ঘষতে ঘষতে বলে, পানু এখনো যায় নাই। রাইত বেড়ে যাচ্ছে, তোরা যাস নাই কেন?
বুবু আপনেরে ডাকে।
অগত্যা রফিককে পর্দার ঘের থেকে বাইরে আসতে হয়। হ্যাজাক লাইটগুলো এখন স্টেজ থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখা হয়েছে, একটা লাল পর্দার ওপার থেকে আলো এসে পড়েছে পানুর মুখে, তাকে দেখাচ্ছে একটা টসটসে আমবেগুনের মতো, রফিক বলে, কী যাও নাই কেন বাড়ি?
পানু কিছু বলে না, তার নাকের দুপাশটা বিস্কারিত হতে থাকে, চোখ দিয়ে পানি গড়ায়, লালচে আলোয় সেই পানির ফোঁটা দুটোকে স্বর্ণবিন্দুর মতো লাগে।
কী হলো, তোমার চোখে কেন জল? নাটকের মুখস্থ সংলাপ ঝেড়ে দেয় রফিক।
তোমার দুঃখ দেইখা দুঃখ পাইছি। তুমি এই পার্ট কেন করছ?
হা হা হা। রফিক হাসে। এইটা তো সত্য না। নাটকের মধ্যে। নাটকের মধ্যে কারও পার্ট দেইখা যদি দর্শক কান্দে, তাইলে সে হইল সেরা অভিনেতা। আমার অভিনয় তার মানে ভালো হইছে। রফিক প্রাণ খুলে হাসে। আহ। আজ তার কী আনন্দের দিন। ওই দিকে মানবেন্দ্র ওরফে মানুদা তারিফ করছেন, আর এদিকে পানু...আজ তার জীবন ধন্য।
কম্পোজিটর কম্পোজ করছে বর্ণমালাগুলো। একটার পর একটা অক্ষর সাজাচ্ছে। এরপর প্রুফ তুলবে। রফিক প্রুফ দেখবে। কম্পোজও সে পারে কিছু কিছু। ম এর পরে আকার দিলে মা হয়, কী রকম জাদু না এই হরফগুলোতে।
হরফের এই জাদুটাই ইদানীং তাকে মন্ত্রীভুত করে ফেলছে। নইলে মানিকগঞ্জ ছেড়ে সে ঢাকা শহরে এসে প্রেসের কাজে লাগে! তার থিয়েটার আর তার পানুকে ফেলে রেখে আসে সে?
রাহেলা খানম পানু তাদের দুই ঘর দুরের প্রতিবেশী। ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছে পানু। তারপর পড়া বন্ধ। ওই দিন, গলি থেকে রাজপথ নাটকের মঞ্চায়ন শেষে তারা বাড়ি ফিরেছিল একসাথে, রাতের পথে ছিল জ্যোৎস্মা আর কুয়াশা আর শিশির। দুরে ঝোপঝাড় থেকে ভেসে আসছিল শেয়াল আর কুকুরের পাল্লা দেওয়া ডাক। রফিক বলেছিল, পানুরে, এরপরের নাটকে তো আমি খুদিরাম হব। আমার তো ফাঁসি হইয়া যাবে। এখন এই সামান্য পাগল হইয়া যাওয়ার সিন সহ্য করতে পারতেছ না, খুদিরাম সাইজা যখন ফাঁসিতে ঝুলব, গান গাব, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি, তখন সহ্য করবা কেমনে?
তোমার খুদিরাম করনের দরকার নাই রফিক ভাই, পানু রফিকের হাত ধরে বলেছিল। আর কী আশ্চর্য, ওই সামান্য একটা হাতের মুঠোয় রফিকের সমস্তটা অস্তিত্ব যেন বন্দী হয়ে গেল মুহুর্তে। তারপর থেকে রফিকের দিবস-রজনী জুড়ে শুধু ওই এক বালিকার মুখ। কেন এই রকম হয়।
কিন্তু তাই বলে খুদিরাম নাটকের রিহার্সাল তো আর বাদ দেওয়া যায় না। কলেজ ফাঁকি দেওয়া শুরু করল সে। ওদিকে পানুর বাবা-মাও পানুর জন্যে পাত্র খুঁজছেন। রফিক আর পানুর মেলামেশাটা নিয়ে কানাঘুষা শুরু হলে ওরা বলল, তাইলে আর বাইরে বাইরে পাত্র খুঁজব কেন। পাত্র যখন ঘরের কাছেই আছে।
ওরা যখন মেলামেশা করছেই, সেইটাকে একটা স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যেই ওদের পানচিনিও হয়ে গেছে। এই তো ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখে ওদের বিয়ে। আর যেহেতু সামনে বিয়ে, নতুন দায়িত্ব, নতুন জীবনের ভার, রফিক তাদের এই বর্ণমালা প্রিন্টিং প্রেসের কাজটায় ইদানীং মনও লাগিয়েছে বেশ।
কিন্তু এর মধ্যে রফিকের মাথায় নতুন চিন্তা জট পাকাতে শুরু করেছে। যে ছাপাখানার গন্ধ তার অসহ্য বোধ হতো, সেটাই তাকে মেশকে আম্বারার মতো টানছে।
ঘটনা ঘটল এইভাবে। বর্ণমালা প্রিন্টিং প্রেসের বৃদ্ধ কম্পোজিটর, চোখে গোল বেশি পাওয়ারের চশমা, কী একটা লিফলেট কম্পোজ করছেন, হঠাৎই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন, এই বুড়া বয়সে বুঝি বেকার হইয়া যাইতে অইব। চাকরি বুঝি আর থাকে না?
রফিক টেবিলে বসে আজ প্রেসের জন্যে কী কী কিনতে হবে, কালি আর কাগজ ইত্যাদি, সেসবের ফর্দ বানাচ্ছিল। ফরিদ চাচার কথা শুনে সে মাথা না তুলে বলে, কী কন চাচা?
হ। বুঝতাছ না চারদিকের বাতাস? লিফলেটে কী লেখছে। উর্দু নাকি এই দেশের ভাষা হইব। সরকারি কাম সব উর্দুতে হইব। তাইলে আমার এই বাংলা হরফ কী হইব। আমি তো এই বাংলা কম্পোজ ছাড়া আর কিছু জানি না। এখন এই বয়সে কি উর্দু কম্পোজ শেখনের টাইম আছে। তোমাগো প্রেস তো আর বন্ধ হইব না ভাস্তা, তোমরা উর্দু টাইপ কিনা আনবা, উর্দু কম্পোজিটর আইব, আমি তো এই বয়সে তোমার চাচি আর অপগন্ড পোলাপান ছয়টা লইয়া রাস্তায় ভিক্ষা করতে থালা হাতে বইয়া পড়ুম।
ওই লিফলেটটার প্রুফ কাটতে গিয়ে রফিকের মনে হলো, প্রুফের সঙ্গে কম্পোজিটর ফরিদ চাচার চোখের পানি লেগে গেছে। নাইলে কাগজটার দুই জায়গায় ভেজা কেন। রফিক লিফলেটটা পড়ে, কী কয়? রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা কেন মেনে নেবে? তাই তো ছাত্ররা ডাক দিয়েছে প্রতিবাদ সমাবেশ আর মিছিলের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হবে এই প্রতিবাদসভা।
ছাপাখানার কাঠের খোপগুলো ভরা বিভিন্ন হরফ। একেকটা খোপে একেক বর্ণ। আবার বিভিন্ন পয়েন্টের ফন্টের অক্ষরের জন্যে একেকটা সারি। রফিক এই টাইপগুলোর দিকে তাকায়। হাতে তুলে নেয় সিসার অক্ষরগুলো। সব উল্টা। এগুলো ছাপ দিলে সোজা হবে। এই অক্ষরগুলো সব ফেলে দিতে হবে। এর বদলে কিনে এনে রাখতে হবে উর্দু অক্ষর!
রফিক বাংলা অক্ষরগুলোর প্রেমে পড়ে যায়। এই প্রিন্টিং প্রেসের কালিঝুলি, কেরোসিন, তারপিন, স্পিরিট, সিসা, লোহার পাত, তুঁতের গন্ধ তাকে আবিষ্ট করে তোলে।
মধ্যখানে সিংগাইর বাড়ি থেকে ঘুরে আসে রফিক। পানুর সঙ্গে দেখা করা দরকার ছিল। সামনে বিয়ে। বিয়েতে কী কী খরচ করতে হবে, পানুর সঙ্গে একটু পরামর্শ করার জন্যেই মূলত যাওয়া। পানু তো কিছুতেই মুখ খুলবে না। বলে, তুমি কী দিবা, দেও। আমি কেন বলব। শেষে পানুর ভাবি মুখ খুলল, আলতা, সাবান, চুড়ি, শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট, স্েমা, পাউডার, আর সোনার জিনিস যা দিবা...
আজ রফিক বেরুচ্ছে সেই কেনাকাটা করার জন্যে। তার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে হবিবরকে সে ডেকে এনেছে বাড়ি থেকে। হবিবর তার ভ্রাতুষ্কপুত্র বটে, কিন্তু তারা সমবয়সী, আর কেনাকাটার ব্যাপারে তার সুনামও আছে। দরাদরির ব্যাপারে হবিবরের প্রতিভা জাদুকরি, সে দুই আনার জিনিস কিনে দুই পয়সা দিয়ে চলে আসে, দোকানদার হাসিমুখে বলে, আবার আইসেন।
ফাল্গুন মাস। রোদটা চড়া। তবু শীতটা আছে বলে রোদটা মিষ্টিই লাগছে। দোকানে আজ ভিড় কম।
সদরঘাট নবাবপুর মার্কেট চষে হবিবর আর রফিক মিলে আলতা, সাবান, চুড়ি ইত্যাদি সস্তার জিনিসগুলো কিনে ফেলে ভেবেছিল শাঁখারিপট্টিতে ঢুকবে স্বর্ণালংকারের জন্যে, কিন্তু এরই মধ্যে রিকশাওয়ালার মুখে শুনল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিকেল কলেজের মোড়ে লড়াই বেধে গেছে। ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে, মিছিল হবে না আজ আর−রফিক সেটাই জানত। তা না হলে সে কি আর মিছিলে যেত না। কিন্তু ছেলেরা যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে শুরু করেছে, আর লড়াইটাও যে জমে গেছে, সেটা শোনা মাত্র রফিক বলল, হবিবর, চল, মিছিলে যাইতে হইব। বুঝস না...
হবিবর ঠিক বুঝল কি বুঝল না, সেই জানে, কিন্তু সেও হাঁটা শুরু করে রফিকের পিছু পিছু।
দুর থেকে শোনা যাচ্ছে স্েলাগান, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই...রফিকের মাথার মধ্যে স্বরে অ স্বরে আ ক খ বর্ণগুলো লাফাতে শুরু করে। সে বলে, হবিবর, জোরে হাঁট।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা মিছিলটা ধরে ফেলে আর মিছিলের সঙ্গে মিশে যায়।
একবার তার পানুর কথা মনে পড়ে। যদি কোনো কারণে পানু শোনে যে রফিক মিছিলে গিয়েছিল, পানু কি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলবে। একদিন রিহার্সাল দেখাতে পানুকে নিয়ে গিয়েছিল রফিক। বয়রা স্কুলের ক্লাস ফাইভের ঘরে রিহার্সাল হচ্ছিল। রফিক যখন গানটা ধরল, একবার বিদায় দে মা ফিরে আসি...
তখন পুরোটা ঘর, এমনকি জানালায় রিহার্সালদর্শী জনতাও নীরব হয়ে গিয়েছিল। এর ভেতরেই বাষ্কেপর উদ্গীরণের আওয়াজ। কেউ ফোঁপাচ্ছে। সেদিকে না তাকিয়েও রফিক বুঝতে পারছিল, এটা পানুই। রফিকের কোনো দুঃখ-কষ্ট, হোক না তা নাটকের কাল্পনিক জীবনে, পানু একদমই সহ্য করতে পারে না।
আহা। আর মাত্র তিন দিন। তিন দিন পরেই রফিকের ঘরে আসবে পানু। তার পর থেকে তাদের যৌথ জীবন। ছাপাখানাটা তাদের নিজস্ব। তবু বিয়ের কার্ডটার ইম্প্রেশন কালকে পর্যন্ত হয়নি। আজ সন্ধ্যার মধ্যেই আমন্ত্রণপত্র বের করে ফেলতে হবে। রাতেই বিয়ের কার্ড আর খরচাপাতি নিয়ে তারা রওনা দেবে মানিকগঞ্জের পথে। কালপরশু কার্ডগুলো বিলিবণ্টন করতে হবে।
রাষ্ট্রভাষা রাষ্ট্রভাষা, বাংলা চাই, বাংলা চাই, স্েলাগানে কন্ঠ মেলাতে মেলাতে রফিক এইসব ভাবে। সামনে পুলিশের ব্যারিকেড। রফিকের চোয়াল শক্ত হচ্ছে, গলার রগ ফুলে উঠছে, কন্ঠস্বর আসমান বিদীর্ণ করতে চাইছে, হাতের মুঠো সুর্যকে ধরবে বলে লম্বা হচ্ছে...
তখনই গুলির শব্দ। রেইনট্রি গাছগুলো থেকে গগনচিলগুলো উড়ে ওঠে, কাকের দল চিৎকার করতে থাকে।
গুলি রফিকের কপালে লাগে। সিসা তার করোটি ভেদ করে মগজে প্রবেশ করলে সে পায় সিসার হরফের গন্ধ। ছাপাখানার গন্ধ।
হাত থেকে বাজারের থলে পড়ে গেলে আলতার শিশি ভেঙে যায়।
রফিকের শরীর ঢলে পড়ে। তার মাথা থেকে রক্ত আর মগজের ধারা আলতার ধারার সঙ্গে মিশে পথের ধুলোয় প্রবাহিত হয়। আর করোটির ফোকর দিয়ে বর্ণমালা প্রিন্টিং প্রেসের ১২ ফন্ট, ১৪ ফন্ট, ১৮ ফন্টের বাংলা বর্ণমালাগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে বেরিয়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে, রফিক খোলা চোখে সেই বর্ণমালাগুলো দেখতে পায়। বর্ণমালা ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল রোদে যেন সোনা হয়ে উঠছে। আর কী যে ভালো লাগছে সেই সিসার গন্ধটুকুন।
রাহেলা খানম পানুর হাতে পানচিনির আংটিটা, কুয়োর পাড়ে ওজু করতে করতে পানু সেটা একবার খুলে কনিষ্ঠায় পরে, তারপর হাত ধোয়া হয়ে গেলে আবার পরে নেয় অনামিকায়, এই সময় তাদের বাঁশঝাড়ে একটা কাক কা কা কা বলে ডেকে উঠলে পানুর বুকটা কেন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে জানে না কেন, রিহার্সালের দিনে একবার বিদায় দে মা বলে রফিক যখন টান ধরেছিল, রফিকের সেই মুখখানা পানুর হঠাৎ করে মনে পড়ে।
একটা ঢিল ছুড়ে মেরে পানু কাকটাকে তাড়াতে চায়।
লেখাটি এখান থেকে নিয়েছি...
কনভার্ট করেছি এখান থেকে
একটা ছবিও দিয়ে দিলাম। ছবির বক্তব্যটি সত্য হোক এই প্রত্যাশায়.....